কাগজ প্রতিবেদক
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. এ. কে. ফজলুল হক ভূঁইয়া বলেছেন, বাংলাদেশে পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ কৃষিপণ্য ও মৎস্যের ফসলোত্তর অপচয় হ্রাসে বাকৃবির বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত হাইব্রিড ড্রায়িং সিস্টেম কার্যকর ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, হাইব্রিড ড্রায়িং সিস্টেমে একই সঙ্গে মাছ, সবজি ও ফলস্বা¯’্যসম্মতভাবে শুকানো সম্ভব। উদ্ভাবিত হাইব্রিড ড্রায়িং প্রযুক্তিটি বাংলাদেশের আবহাওয়া ও কৃষি পরিবেশের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে, যা অপর্যাপ্ত শুকানো ও সংরক্ষণ অবকাঠামোর কারণে নষ্ট হওয়া কৃষিপণ্য ও মৎস্যের পুষ্টিমান ও বাজারমূল্য রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
শনিবার দুপুরে বাকৃবির সৈয়দ নজরুল ইসলাম সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা পরীক্ষণ ও পরামর্শ ব্যুরো (বিআরটিসি)’র চেয়ারম্যান এবং কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মো. আব্দুল মজিদ এর সভাপতিত্বে আয়োজিত হাইব্রিড ড্রায়িং সিস্টেম প্রকল্পের সমাপনী সেমিনারে তিনি একথা বলেন এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রকল্পটির প্রতি সর্বো”চ প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসি’র ব্যব¯’াপনা পরিচালক মতিউল হাসান। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসি’র উপ-ব্যব¯’াপনা পরিচালক ও প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা ড. তাপস কুমার পাল, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সং¯’া (এফএও), বাংলাদেশ-এর প্রিসিশন অ্যাগ্রিকালচার ও টেকনিক্যাল স্পেশালিস্ট এবং হাইব্রিড ড্রায়ার প্রকল্পের উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মো. মনজুরুল আলম, প্রকল্পের মূল গবেষক বাকৃবির অধ্যাপক ড. চয়ন কুমার সাহা। সেমিনারে দেশের শিক্ষা, ব্যাংকিং ও উন্নয়ন খাতের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বগণ অংশগ্রহন করেন। প্রকল্পটিতে কারিগরি সহায়তা প্রদান করেছে এডিআই ফাউন্ডেশন, ঢাকা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসি’র ব্যব¯’াপনা পরিচালক মতিউল হাসান বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নে ব্যাংকের অবিচল প্রতিশ্রুতি ও সিএসআর বিনিয়োগের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
মূল প্রবন্ধ উপ¯’াপন করেন প্রকল্পের প্রধান গবেষক এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্ম পাওয়ার অ্যান্ডমেশিনারি বিভাগের প্রফেসর ড. চয়ন কুমার সাহা। তিনি প্রকল্পের লক্ষ্য, কার্যক্রম, উদ্ভাবনী প্রযুক্তি, মাঠ পর্যায়ের প্রভাব এবং বাংলাদেশের লক্ষ্যঅঞ্চলগুলোতে পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ কৃষিপণ্য ও মৎস্যের ফসলোত্তর অপচয় হ্রাসে অর্জিত উল্লেখযোগ্য সাফল্যের বিস্তারিত চিত্র উপ¯’াপন করেন। তিনি জানান, বাংলাদেশে ফল, সবজি ও মাছের আহরণোত্তর ক্ষতি দীর্ঘদিন ধরে কৃষিখাতের একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ফল ওসবজির গড়ে প্রায় ৩২% এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৪০%-এর বেশি আহরণোত্তরক্ষতি হয়, যেখানে মাছের ক্ষেত্রে এ ক্ষতির হার ৭% থেকে ২৯% পর্যন্ত পৌঁছায়।এই পরি¯ি’তি মোকাবেলায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাদল উদ্ভাবিত সোলার হাইব্রিড ড্রায়ার প্রযুক্তি একটি যুগান্তকারী সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

বিএইউ-এডিআই হাইব্রিড ড্রায়িং প্রযুক্তি বাংলাদেশের কৃষি খাতের অন্যতম জটিল সমস্যা সমাধানে অসাধারণ সম্ভাবনা প্রদর্শন করেছে। দেশে ফসলোত্তর অপচয় দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষকদের জীবিকার জন্য একটি গুরুতর হুমকি হয়ে আসছে এবং এই প্রকল্পটি সেই সমস্যার একটি বিজ্ঞানসম্মত ও কার্যকর সমাধান উপ¯’াপন করেছে। বিএইউ-এডিআই সোলার হাইব্রিড ড্রায়ার একটি বহুমুখী ও শক্তি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি। এই যন্ত্রে একই সঙ্গে মাছ, সবজি ও ফলস্বা¯’্যসম্মতভাবে শুকানো সম্ভব। একটি স্ব”ছ পলিকার্বোনেট আবরণ সৌরতাপসংগ্রহ করে, যা চিমনি ইফেক্টের মাধ্যমে শুকানোর চেম্বারে স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিতহয়। প্রচলিত রোদে শুকানোর তুলনায় এই পদ্ধতিতে খাদ্যের পুষ্টিগুণ ৮০ থেকে৯৫% পর্যন্ত অক্ষুণœ রাখা সম্ভব। যন্ত্রটিতে মাইক্রোকন্ট্রোলার প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট আইওটি নিয়ন্ত্রণ ব্যব¯’া সংযুক্ত, যা তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও সৌর বিকিরণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করে। সৌরশক্তি অপ্রতুল হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈদ্যুতিক হিটার চালু হয়ে ২৪ ঘণ্টানিরব”িছন্ন কার্যক্রম নিশ্চিত করে। প্রতিটি ব্যাচে ৩০ থেকে ৩৫ কেজি পর্যন্ত পণ্য শুকানোর সক্ষমতা রাখে এই যন্ত্রটি এবং পোকামাকড়, ধুলা, বৃষ্টি ও দূষণ থেকেসম্পূর্ণ সুরক্ষিত পরিবেশে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করে।
এই উদ্ভাবনী প্রযুক্তি কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্যসংরক্ষণের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। আহরণোত্তর ক্ষতি হ্রাস করেপণ্যের পুষ্টিমান ও বাজারমূল্য অক্ষুণœ রেখে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের এই সক্ষমতাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টগবেষকরা আশাবাদী। এই প্রকল্পটি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি ব্যাংকিং খাতের মধ্যে একটি আদর্শ সহযোগিতার দৃষ্টান্ত ¯’াপন করেছে। এটি প্রমাণ করেছে যে, সিএসআর তহবিলকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করে কৃষক জন্য দীর্ঘ¯’ায়ী ও কার্যকর সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব। এই উদ্যোগের মাধ্যমে উদ্ভাবিত হাইব্রিড ড্রায়িং প্রযুক্তিটি বাংলাদেশের আবহাওয়া ও কৃষি পরিবেশের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে, যা অপর্যাপ্ত শুকানো ও সংরক্ষণ অবকাঠামোর কারণে নষ্ট হওয়া কৃষিপণ্য ও মৎস্যের পুষ্টিমান ও বাজারমূল্য রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশে পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ কৃষিপণ্য ও মৎস্যের ফসলোত্তর অপচয় হ্রাসে হাইব্রিড ড্রায়িং সিস্টেম”শীর্ষক প্রকল্পটি মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসি-এর কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কর্মসূচির আওতায় বাস্তবায়িত হয়েছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে শুরু হওয়া এই ২৪ মাসব্যাপী প্রকল্পে মূল গবেষক হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন অধ্যাপক ড. চয়ন কুমার সাহা (বাকৃবি)। সহযোগী গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন অধ্যাপক ড. পলি কর্মকার (বাকৃবি), ড. সুরজিৎ সরকার (এডিআই) এবং মো. আবু হানিফ (বাকৃবি)। গবেষণায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন চারজন শিক্ষার্থী: মো. রায়হানুল করিম, জাকিয়া খাতুন, তাসলিমুন নাহার এবং সুদীপা সাহা। ###